ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংক্ষেপে ডুয়েট বাংলাদেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের একমাত্র উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান।
সবুজ সবুজে সমারোহ এই ক্যাম্পাসে প্রতিদিন বিচরণ করে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন।সময়ের গতিতে এগিয়ে চলে একঝাঁক মেধাবীদের পথচলা।সকাল হতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের প্রতিটা পিচ ঢালা রাস্তা আর ক্লাস রুম।মনে হয় কারো হাতে বিন্দুমাত্র সময় নেই।সবাই ছুটে চলে অধরা স্বপ্নের পিছনে। সেই ডুয়েটের ইতিহাস আর সাফল্যে গল্প বলবো আজকে।
অবস্থান:
রাজধানী ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে এবং গাজীপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে ভাওয়াল গড় এলাকায় ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০.২৯ একর জমির উপর অবস্থিত ( বর্তমানে আরো একটি নতুন ক্যাম্পাসের কাজ চলমান আছে)।
ইতিহাস:
জন্মলগ্ন থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথে জুড়ে আছে অনেক ইতিহাস।
১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদ ১২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। সেসময় এখান থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিকাল এবং ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে চার বছর মেয়াদি ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করা যেতো। ১৯৮৩ সালে কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং এর নাম পরিবর্তন করে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (ডিইসি) নামে গাজীপুরের বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সম্মুখীন হওয়া বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় ১৯৮৬ সালে সরকারের অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ডিইসিকে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (বিআইটি) ঢাকাতে রূপান্তরিত করা হয়। সর্বশেষ ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
ভর্তি যোগ্যতা:
দেশের বিভিন্ন পলিটেকনিক থেকে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরিক্ষার সুযোগ পান।
প্রতি বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৬৭০ জন ছাত্রছাত্রী প্রকৌশল এবং স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হয়ে থাকে। প্রতিবছর ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় ১২ হাজার জন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৬% ছাত্রছাত্রী এখানে ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটা অগ্নিপরীক্ষা।সারাদেশ কেবল মাত্র একটা বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারণে এখানে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ছাত্রছাত্রীদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।
অনুষদ এবং বিভাগ সমূহ:
বর্তমানে ডুয়েটে তিনটি অনুষদের অধীনে দশটি বিভাগ রয়েছে। এখানে স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হয়। এছাড়া বাংলাদেশের নয়টি পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি হল ডুয়েট।
শিক্ষার্থীদের সাফল্য:
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও খুব দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।শিক্ষার্থীদের ডিপ্লোমা চার বছর এবং বিএসসি চার বছর মোট আট বছরের প্রকৌশল ডিগ্রি থাকার কারণে তারা অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের থেকে কর্ম ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে থাকে এবং দক্ষতার সাথে কাজ করে থাকে।
দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও শিক্ষার্থীরা চাকরির জন্য বসে থাকেন। অথচ এখানকার শিক্ষার্থীরা ছয় মাসও বসে থাকতে হয় না। অনেক শিক্ষার্থী পাস করার আগেই ক্যাম্পাসের জব ফেয়ারে অংশগ্রহণ করে চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন। মেটা, টেসলার মতো বড় প্রতিষ্ঠানেও আমাদের শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন।’ বলেছেন ছাত্রকল্যাণ সংস্থার পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম।
তড়িৎ কৌশল বিভাগের ৩য় বর্ষের এক শিক্ষার্থী জানালেন, তাদের নিয়মিত ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। তিনি বলেন, কোনো কারণে ক্লাস বা ল্যাব মিস হয়ে গেলে নিজেরই বেশি ক্ষতি হয়। তাই সহজে কেউ ক্লাস মিস করে না। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের একজন
শিক্ষার্থী বলেন, একসময় চিন্তা হতো ডিপ্লোমা করেছি, কিন্তু পরবর্তীকালে আমার কী হবে। এখন আর সেটা মনে হয় না। প্রকৌশলীদের জন্য দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ায় আমরা গর্ববোধ করছি।’
কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস:
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম যেমন খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক সাথে যুক্ত। এছাড়া শিক্ষার্থীদের পরিচালনায় বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। এগুলি হলো: ডুয়েট বিজ্ঞান ক্লাব,ডুয়েট নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাব,ডুয়েট অটোমোবাইল ক্লাব,ডুয়েট এনার্জি ক্লাব,ডুয়েট টেক্সটাইল ক্লাব,ডুয়েট সাংবাদিক সমিতি,ডুয়েট রোবটিক্স ক্লাব,ডুয়েট ইনোভেশন সোসাইটি,ডুয়েট ক্যারিয়ার এন্ড রিসার্চ ক্লাব,ডুয়েট কম্পিউটার সোসাইটি।
ডুয়েট রোবটিক্স ক্লাব দেশ এবং দেশের বাইরে বেশ সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।
ডুয়েটের সাম্প্রতিক গবেষণা:
ন্যানো টেকনোলজিকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বমানের গবেষণার চেষ্টা চলছে ডুয়েটের ল্যাবগুলোতে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানালেন, জিরকোনিয়াম, সিলভার, অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড, টাইটানিয়াম, বোরনসহ বিভিন্ন ধরনের ন্যানো পার্টিক্যাল তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রাফেনের মতো ‘টুডি ম্যারেটিয়াল’ও তৈরি হচ্ছে এখানে, যা সেমিকন্ডাক্টর, ন্যানো ইলেকট্রনিক ও ন্যানো অপটিক্যাল ডিভাইসে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বায়োমেডিকেল খাত, এনার্জি স্টোরেজ, পানি পরিশোধনসহ নানা ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া বোরোফেনের মতো ‘টুডি ম্যাটেরিয়াল’ তৈরির নতুন দুটি পদ্ধতিও আবিষ্কার করা গেছে। এরই মধ্যে সেগুলো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। ন্যানোফাইবারাস মেমব্রেন, নতুন ধরনের থ্রিডি ম্যাটেরিয়াল, ন্যানো কম্পোজিট, হাইব্রিড কম্পোজিট বায়োপ্লাস্টিকসহ আধুনিক ম্যাটেরিয়াল তৈরির প্রক্রিয়াও চলমান।
দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে এসব উপাদান তৈরি করা যায় কি না, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। গুণাগুণ পরীক্ষা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারও করা হচ্ছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য, পাটের আঁশ, কলাগাছের আঁশ, কচুরিপানাসহ এ ধরনের বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেগুলোকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে।
ক্যাম্পাসের পরিধি, শিক্ষার মান বাড়াতে চাই:
ড.মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, উপাচার্য, ঢাকা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জানান:
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করতে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম জায়গা ডুয়েটে। এখানে ছিল ২৩ দশমিক ৪২ একর। মূল ক্যাম্পাসের সঙ্গে জায়গা না থাকায় ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে কিছু জায়গা নেওয়া হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য হল ও কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ চলছে। আরও জায়গা নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। বর্তমানে একটি আধুনিক প্রশাসনিক ভবনসহ বেশ কিছু উন্নয়নকাজ চলছে। ক্যাম্পাসের পরিধি ও শিক্ষার বাড়ানো আমাদের মূল লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে এখানে ছয় মাসের একাডেমিক ক্যালেন্ডার করা হতো। এখন এক বছরের করা হচ্ছে। সেই একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমরা শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।