অতৃপ্তি ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতি

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
ফাইল ফটো। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট।
ফাইল ফটো। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট।

তরুণদের নেতৃত্বে ‘আরব স্প্রিং’ সফল হয়নি। থাইল্যান্ডে ‘রেড শার্ট’ আন্দোলন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলন অভূতপূর্ব সফলতা পেয়েছে। তাদের নিরস্ত্র ধাওয়ায় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অসহিষ্ণু, নিষ্ঠুর, অহঙ্কারী ও ক্ষমতাধর শেখ হাসিনা পলায়নের পথ বেছে নেবেন, তা অকল্পনীয়।

শুধু শেখ হাসিনা নন, তাঁর পীড়নযন্ত্রের সব চালক, পরিচালক, কারিগর ও মিস্ত্রিরা যে যেদিকে পারেন দুদ্দাড় পালিয়েছেন। যাঁরা নিতান্তই ভাগ্যবিড়ম্বিত তাঁরা তাঁদের দীর্ঘদিনের যত্নে লালিত সফেদ দাড়ি মুণ্ডন করে চেহারায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা সত্ত্বেও ধরা পড়ে ‘লাল দালানে’ গেছেন। তাদের বাঁচাতে কেউ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে’ তোলেনি।

শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে, স্বাধীন দেশ পেয়ে এবং এমনকি জাতির পিতা হয়েও তাঁর আরও কিছুর আকাংখা তখনো পূরণ না হওয়ায় অতৃপ্ত ছিলেন। তাঁকে তৃপ্ত করেছিল ‘রক্ষীবাহিনী’ নামে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী গঠন; ‘বাকশাল’ নামে একদল প্রতিষ্ঠা, ‘এক নেতা, এক দেশ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ স্লোগান। আজীবন ‘সার্বভৌম সম্রাটতুল্য’ ক্ষমতার অধীশ্বর থাকার ঘোষণাটুকুই বাকি ছিল। তার ভাগ্যদোষে তা হয়নি। মুজিবের সব কৃতিত্ব ও অবদান জনগণের মন থেকে বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল।

শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসন ও বুভুক্ষু মানুষের আর্তনাদে স্বাধীনতা, লাল সবুজ পতাকা ও পৃথক মানচিত্রের মালিকানা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক কবি আল মাহমুদ কারাগার থেকে লিখেন :

‘পাখিরা কত স্বাধীন,

কেমন অবলীলায় দেয়াল পেরিয়ে যাচ্ছে,

জীবনে এই প্রথম আমি পাখির সৌভাগ্যে কাতর হলাম --।’

কবি রফিক আজাদের কলম চিঁড়ে বের হয়েছিল :

“উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী

আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ

ভাত দে হারামজাদা,

তা না হলে মানচিত্র খাবো।”

এই অতৃপ্তির কারণগুলো সৃষ্টি করেছিল স্বাধীনতা অর্জনের একক দাবিদাররা। কোনো কিছুতেই তাঁদের অন্তর ভরেনি এবং তা ব্যাপ্ত হয়েছে সাধারণ্যে। প্রত্যেকে যাঁর যাঁর অবস্থানে অতৃপ্ত। জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি তাঁদের এই সীমাহীন অতৃপ্তির কারণেই লিখেছিলেন :

‘ নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।

অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে,

শেষ হয়ে হইল না শেষ।’

কিসে তৃপ্ত হবে বাঙালির হৃদয়? স্বাধীনতায়? গণতন্ত্রে? ১৯৭১-এ যেমন স্বাধীনতা অর্জনে তাঁরা তৃপ্ত হয়নি, হারানো গণতন্ত্র ২০২৪-এ ফিরে পেয়েও বাঙালি হৃদয় পরিতৃপ্ত হয়নি। গণতন্ত্রের কবর রচনাকারী শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার প্রাণ দিতে হয়েছিল। জিয়াউর রহমান কবর থেকে তুলে গণতন্ত্রের লাশে জীবন সঞ্চার করে বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ এনে দিয়েছিলেন।

কিন্তু তা মানবেন কেন সকল ক্ষমতার উৎস শেখ হাসিনা। পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’য় তো বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থান নেই। গণতন্ত্রের খোলসে বাকশাল বাস্তবায়নই ছিল তার আরাধ্য। শেখ মুজিব তাঁর দোর্দণ্ড প্রতাপের যুগেই জনগণকে ‘বাকশাল’ গেলাতে পারেননি। শেখ হাসিনা তো শেখ মুজিব ছিলেন না। তাঁকে কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। জনগণের গণতন্ত্রকেই তিনি কাজে লাগান ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনে।

দেশবাসী শেখ হাসিনাকে ‘ভোট চোর’, নিশিরাতের ভোটে নির্বাচিত’ অথবা ‘বিনা ভোটের প্রধানমন্ত্রী’সহ যত নিন্দাসূচক বিশেষণে বিভূষিত করুক না কেন, দুনিয়াকাঁপানো ঘটনা ছাড়া কোথায় ভোট চুরি হয়েছে, প্রতিপক্ষকে প্রার্থী হতে দেওয়া হয়নি- এসব খবর কে রাখে! অতএব ‘দেশরত্ন’ শেখ হাসিনা পরিণত হন নজীরবিহীন ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’(?) নির্বাচনে ‘নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী’, ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’, ‘সার্বভৌত্বের প্রতীক’, ‘পরিবর্তনের অগ্রদূত’, ‘উন্নয়নের পথিকৃৎ’। কথায় বলে ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’- পিতা শেখ মুজিবকেও কি তিনি ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন অথবা পিতাকে শুধু অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন?

শেখ হাসিনার গণতন্ত্রের মাঝে শেখ মুজিবের ‘বাকশাল’ খুঁজে পেতে জনগণের বিলম্ব হয়নি। তারা ‘ঘর পোড়া গরু’। ‘আকাশে সিঁদুরে মেঘ’ দেখে ভীত হয়ে পড়েছিল। নিষ্পেষিত জনগণ খড়গহস্ত হয়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের ভিড়ে মিশে গিয়েছিল। জিয়াউর রহমানের এনে দেওয়া গণতন্ত্রকে পুনরায় হত্যার অপরাধে শেখ হাসিনার জীবন সংশয় হয়ে উঠেছিল। না পালিয়ে তার উপায় ছিল না। কবি শামসুর রহমানের উপদেশ স্মরণ করে তিনি পালিয়েছেন:

“পালাও, পালিয়ে যাও,

পালাও, পালাতে থাকো,

পালাও, তোমার না পালিয়ে

রক্ষা নেই। দেখতে পাচ্ছ না, চারদিক থেকে ওরা

তোমাকে ধরবে ঘিরে, পালাও, পালাও ----।” শেখ হাসিনা পালিয়েছেন।

কিন্তু অতৃপ্তি তার পিছু ছাড়েনি। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের নিরাপদ আশ্রয় ও আতিথ্যে থেকে তার অতৃপ্তিজনিত আস্ফালন, হম্বিতম্বি করছেন।

অতৃপ্তি তাঁর একার নয়, সবার। সংস্কার স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি সব যেন এক বছরেই অর্থহীন হয়ে গেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মধ্যে বিভক্তি ঘটেছে। কারও কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত সমন্বয়কদের পক্ষে টানার চেষ্টাও করছে। বিএনপি ধরেই নিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পর তাঁরাই ক্ষমতায় যাচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সরকারকে তাঁরা তোয়াক্কাই করেন না।

তাঁদের নিষ্ক্রিয়তায় আওয়ামী লীগ যে ইদানীং কচ্ছপের মতো খোলস থেকে মাথা বের করে পরিস্থিতি যাচাই করছে, তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার কোনো ইচ্ছা বা প্রস্তুতি বিএনপির নেই।

মাঠের আন্দোলনে বিএনপি অতীতে কখনো ভালো কিছু করতে পারেনি। নেতৃত্ব যত দিন বেগম খালেদা জিয়ার হাতে ছিল, তিনি তাঁর আপসহীন দৃঢ়তায় দল পরিচালনা করেছেন। বিএনপি পরিচালিত হচ্ছে অনিবাসী নেতৃত্ব দ্বারা। বিএনপি অপেক্ষা করছে অপরের আন্দোলনের সাফল্যের ফসল নিজ ঘরে তোলার। অতীতেও জনগণ তাদের নির্বিকার ভূমিকার বিচার করেছে, ভবিষ্যতেও করবে।

সম্পর্কিত